channel 24

সর্বশেষ

  • লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দায়িত্ব ইসির: ওবায়দুল কাদের...

  • ভালো প্রার্থী পেলে মহাজোটের অন্য দলকে আসন ছাড়বে আ.লীগ

  • মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ঐক্যবদ্ধ, বিজয় সুনিশ্চিত: নাসিম

  • বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকা অসাংবিধানিক: ড. কামাল

  • সরকার ইচ্ছামতো বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে: ফখরুল

  • নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করলে জাতি তাদের ক্ষমা করবে না: বি. চৌধুরী

  • প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চায় না ইসি, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে ছাড় নয়: কমিশনার শাহাদাত

  • কাল শুরু পিইসি ও ইবতেদায়ি পরীক্ষা; থাকছে না এমসিকিউ

কক্সবাজারে দস্যুজয়ের নেপথ্যে

কক্সবাজারে দস্যুজয়ের নেপথ্যে

গত ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও র‍্যাবের মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে প্রথমবারের মতো, আত্মসমর্পণ করেছে কক্সবাজার উপকূলের ত্রাস ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৪৩ সদস্য। এরমধ্যে ৫টি বাহিনীর ৩৭জনই আত্মসমর্পণ করেছে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের স্টাফ রিপোর্টার আকরাম হোসাইনের হাত ধরে। দীর্ঘ ৬ মাস চেষ্টার পর আকরাম তাদের র‍্যাবের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে সক্ষম হন। শু

শুরু থেকে আত্মসমর্পণপর্ব পর্যন্ত আদ্যোপান্ত জানবো আকরাম হোসাইনের কাছে-

যেভাবে ক্যামেরার সামনে

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেড়াতে গিয়ে বান্দরবানে দেখা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জলদস্যু জাম্বুর সাথে। তার বাড়ি সোনাদিয়া দীপে। সোনাদিয়ায় প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে সে বান্দরবান অবস্থান করছিল। তিনি জলদস্যূ জানতে পেরে তার সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলি। আমি তখন অন্য একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল। এরপর থেকেই দস্যুদের সাথে যোগাযোগ শুরু। চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে যোগ দেবার পর সেই যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে দেই। লক্ষ্য, মহেশখালি উপকূলে সক্রিয় বাহিনীগুলো নিয়ে অনুসন্ধানী কিছু প্রতিবেদন করা। দীর্ঘদিন তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করি। তাদের আস্থা  অর্জনের চেষ্টা করি। কারণ এই অন্ধকার জগতের মানুষ গুলো তাদের আপনজনকেও বিশ্বাস করে না। তাদের মনমানসিকতা বোঝার চেষ্টা করি। পরবর্তীতে তারা আমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালানোর পর ২০১৮ সালে তারা ক্যম্যারার সামনে এসে কথা বলতে রাজি হয় । এরপর তাদের নিয়ে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে প্রতিবেদন তৈরির জন্যে তাদের প্রস্তাব দেই । এই প্রস্তাব দেওয়ার পর তাদের দলগতভাবে মতপার্থক্য ছিল, অবিশ্বাস ছিল। আবার সেই অবিশ্বাস দূর করে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যে প্রাণান্ত চেষ্টা শুরু করি। পরবর্তীতে তারা প্রতিবেদন তৈরিতে সম্মতি জানায়। এরপর চলতিমবছরের মার্চে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে মহেশখালির জলদস্যুদের নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। অনুসন্ধানী সেই প্রতিবেদনে তাদের সুখ-দুখের কথাও তুলে ধরা হয় । বলে রাখি, জলদস্যুদের সাথে আমার যোগসূত্রের সেই জাম্বু ২০১৭ সালে বন্দকুযুদ্ধে মারা গেছে। যদিও তার আগে আমরা কাজ করি মহেশখালির অস্ত্রের কারিগরদের নিয়ে। তাদের নিয়েও প্রচার হয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।  

অন্ধকার জীবন

মহেশখালি হচ্ছে দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। আদিনাথ মন্দির, মিষ্টিপানসহ নানা কিছুর জন্য বিখ্যাত এই জনপদ। পর্যটনের জন্যও খ্যাতি আছে ৮ টি ইউনিয়ন ও  সাড়ে ৩লাখ মানুষের এই দ্বীপের। সেখানেই বনে-জঙ্গলে আছে অনেকগুলো জলদস্যু, সন্ত্রাসী বাহিনী। তৈরি হয় অস্ত্র। এমন বাহিনী আছে কক্সবাজারের আরেকদ্বীপ কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালি, আনোয়ার, সন্দ্বীপ আর নোয়াখালির হাতিয়া পর্যন্ত। যারা একই নেটওয়ার্কের।  

কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মহেশখালির জলদস্যুদের এক অন্ধকার জীবন। যে জীবনে আর দশটি মানুষের মতো নেই হাসি, আনন্দ, স্বতস্ফূর্ততা। সারাক্ষণ শুধু ভয়ের পরিবেশ। কখন জানি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে পড়ে। উপকূলের কাদামাটি, বন আর সাগরের নিস্তরঙ্গ জলই কেবল তাদের সঙ্গী। তাদের বলি, মহেশখালিতে সরকার বহু উন্নয়ন কাজ করছে। লাখ কোটি টাকার অনেক বড় প্রকল্প হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেখানকার মানুষের জীবন বদলে যাবে। আপনারা এরমধ্যে কতদিন আর লুকিয়ে থাকতে পারবেন!

সেটা শুনে জলদস্যুরা আমাকে বলেছেন, অনেকে ৫-৬ বছর পর্যন্ত পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখেননা কতদিন! কোন যোগাযোগ করতে পারেননা। ঈদ-পার্বণে স্বজনদের কাছে যেতে পারেননা। সন্তানরা কী পরিচয়ে বড় হবে। তাদের প্রায় সবার ভিতরেই একধরনের অনুশোচনা।  প্রায় সবার কন্ঠেই ছিল আকুতি, আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। এমন দুর্বিষহ জীবনে আর থাকতে চাইনা।

আত্মসমর্পণ করছে মহেশখালীর জলদস্যু বাহিনী

সংযোগ এবং সংগ্রাম

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পর আমার সাথে যোগাযোগ করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে র‍্যাবের তরফ থেকে বলা হয়, জলদস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে তাদের সহায়তা দেয়া হবে। নির্দ্বিধায় তারা আসতে পারেন। তাদের সেই মেসেজ পৌছে দিই, জলদস্যুদের কাছে। আশ্বস্ত করা হয়, তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদেরকে বরণ করে নেওয়া হবে। এরপর দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সম্মতি দেয়। তাদের সাথে আলোচনার স্থানগুলো ছিল জনবিছিন্ন দুর্গম পাহাড় আর প্যারাবন। সেখানে নিজের সাথে আর কাউকে  নেয়া যায়না। তাদের দেয়া লোকের সাথেই সেখানে পৌছাতে হয়। মোবাইল নিয়ে যাওয়ায় ছিল নিষেধাজ্ঞা। সাথে সব কঠিন নিয়মতো ছিলই। কোনো কোনো সময় চোখ বেঁধে ফেলা হয়, যাতে রাস্তা চিনতে না পারি। ছিল অনেক গডফাদারের হুমকি আর প্রলোভন। বিশেষ মহলের বাগড়াতো ছিলই। অনেকেই চায়নি তারা আলোর পথে ফিরে আসুক। অনেকে সন্দেহ ছড়াতে চেয়েছে। ফলে জলদস্যুরা রাজি হলেও কখনো কখনো আবার পিছুটানও দিয়েছে। আবার বুঝিয়ে তাদের সঠিকপথে আনতে হয়েছে। র‍্যাবের অবস্থানও ছিল দৃঢ়। তারা পিছনে ফিরতে চায়নি। আমাকে বারবার তাগাদা দিয়েছে। তারাও দিনের পর দিন জলে জঙ্গলে ঘুরেছেন। আমি বা চ্যানেল টোয়েন্টিফোর কোন কৃতিত্বের জন্য নয়, এই কাজটির পিছনে লেগে থাকার কারণ, সামাজিক এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা।

অতঃপর আলোর পথে যাত্রা

ছয়মাসের চেষ্টায়, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষপর্যন্ত আলোরপথে আনা গেছে ৫টি বাহিনীর ৩৭জনকে। যারা জমা দিয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। এসব বাহিনীর সদস্য সংখ্যা যদিও অনেক। তাদের কেউ কেউ আগে থেকে কারাগারে। কেউ মারা গেছে। কেউ কেউ আবার অন্ধকারপথে পালিয়েছে। কিন্তু যারা সত্যিকার স্বাভাবিক জীবন চেয়েছে তারা ফিরে এসেছে। এরমধ্যে আঞ্জু, রমিজ, জালাল, আলাউদ্দিন, আইয়ুব বাহিনী-মহেশখালি-কক্সবাজার উপকূলে আতঙ্ক। বহু খুন খারাবি, ডাকাতিতে জেলেদের তটস্থ করে রেখেছিল তারা। আত্মসমর্পণে তাদের বড় কোন চাওয়া ছিলনা, ছিল শুধু-তাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার, স্বভাবিক জীবনে নিরাপত্তা আর পুনর্বাসন। নিরাপত্তা চাওয়ার কারণ, এসব বাহিনী চলতো স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর ছত্রছায়া। এসব ব্যক্তি চায়নি জলদস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে আসুক। কারণ তারা ফিরলেই প্রভাবশালীদের আয়-রোজগার, প্রতিপত্তি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই, তারা যদি পরে কোন ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায় সেজন্য নিরাপত্তা চাওয়া।

চ্যানেল 24'র মধ্যস্থতায় ৫ জলদস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণ

অবশ্য, আত্মসমর্পণ করা ছয়টি বাহিনীর মধ্যে কালাবদা বাহিনীর ৬ সদস্যকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনায় কাজ করেন যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মহসিন উল হাকিম।

চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের চেষ্টায়, র‍্যাবের আন্তরিক সহযোগিতায় প্রথমপর্যায়ে এসব জলদস্যু আত্মসমর্পণ করায় মহেশখালির মানুষ কত যে আনন্দ-উচ্ছ্বসিত সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। সেইসাথে জলদস্যুদের স্বজনরাতো আছেই। ২০ অক্টোবর আত্মসমর্পণের দিন, জলদস্যুদের সাথে স্বজনদের মিলনের দৃশ্যটি বহুদিন চোখে গেঁথে রাখার মতোই। আর উপকূলে জেলেদের স্বস্তিতো আছেই। আশা, বাকি যেসব বাহিনী আছে সেগুলোও ফিরবে আলোর পথে। চট্টগ্রাম-উপকূল একদিন দস্যুমুক্ত হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ